হাদিসের আলোকে উত্তম হবার পাঁচটি সহজ উপায় Leave a comment



নিজের আত্নার উন্নতি অথবা স্বত্তার উন্নতির জন্য আমরা আমাদের চারপাশে অনেক কিছুই দেখি। দুনিয়াতে সফল হবার জন্য হাজারো টিপস আমাদের চারপাশে গিজ গিজ করে। শিব খেরা থেকে শুরু করে ডেল কার্নেগী এবং এরকম আরো অনেকেই বলে গেছেন সফল হবার উপায়গুলো। কিন্তু আমাদের দ্বীনে যে এর চেয়ে আরো সহজ কিছু টিপস বা উপায় মহান আল্লাহপাক আমাদের বাতলে দিয়েছেন, তাঁর খবর আমরা কইজন রাখি। কিভাবে একজন উত্তম মুসলিম হওয়া যায়, তাঁর আলোচনা আমরা এই প্রবন্ধে করার চেষ্টা করব। এজন্য কিছু সাধারণ হাদীস এখানে বর্ণনা করা হবে ইনশাল্লাহ।
মুমিন হিসেবে আমাদের প্রতিনিয়ত নিজেকে উত্তমের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকতে হবে। কারন, মুমিন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যার আজকের দিন  গতকালের চেয়ে উত্তম হলনা, সে ধংস হল। এই লেখায় যে পাঁচটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি পালন করলে ইনশাল্লাহ মুমিন বান্দা হিসেবে আল্লাহপাকের কাছে কবুলিয়াতের আশা করা যাবে। আমরা দুনিয়াতে যত সফলই হই না কেন, মহান আল্লাহপকের কাছে মুমিন বান্দা হিসেবে কবুলিয়াত না পেলে এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর হয়না।  

তোমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে উত্তম যার হাত ও মুখ হতে অন্য মুসলিম নিরাপদ[মুসলিম]

উত্তম মুমিন বান্দা হতে হলে এই হাদিসের উপর আমল করা অবশ্য কর্তব্য আরকেজন মুসলিম নিজের মুখ হাতের অনিষ্ট থেকে দূরে থাকা যেমন ঈমানের দাবী, তেমনি যদি এই হাদিসের উপর আমল না করা হয় তাহলে কখনই সেই ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারেনা মুমিন হিসেবে অবশ্যই অন্য মুমিন ভাইকে আপনার কাছে নিরাপদ মনে হতে হবে এক মুমিন অপর মুমিনের প্রতি দয়ালু থাকবে, তাঁর কাছ থেকে আঘাত তো দুরের কথা, কটূ কথা শুনবেনা এজন্য নিরিবিলিতে নিজেকে প্রশ্ন করুন, “আমি কি আরেকজনের বদনাম করি, গীবত করি? আমি রেগে যাই বলে অন্যরা কি আমাকে ভয় পায়? অন্যরা আমাকে বিশ্বাস করেতো?” এই প্রশ্ন গুলোর শক্তি কিন্তু অনেক এই প্রশ্নের উত্তরগুলোই কিন্তু আমাদেরকে আমাদের আসল রুপ চেনাবে এই প্রশ্ন গুলোর উত্তরেই জানা যায় যে, আমাদের থেকে অন্য মুসলিম ভাই কি নিরাপদ? অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কোন অবস্থাতেই যেন আমাদের কথা বা কাজ দ্বারা অন্য ভাই কষ্ট না পায় এটাই প্রথম সূত্র

“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যার আখলাক্ব (চরিত্র) উত্তম।” [বুখারী]

ইসলাম শুধু নিছক নামায, রোযা বা এধরনের আমলের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দ্বীনে চারিত্রিক গুনাবলীর প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই বলা হয়েছে, উত্তম চরিত্রের ওজন মীযানের পাল্লায় অনেক বেশী হবে। আমরা অন্য মানুষের সাথে কিভাবে আচরণ করছি সেতা দেখেই বোঝা যায়, আমাদের মাঝে সঠিক দ্বীনের জ্ঞান কতটুকু আছে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমরা এটা মনে রাখিনা। আমরা সহসাই মানুষের সাথে কর্কশ ব্যবহার করি, তাদের প্রতি সহজেই রুষ্ট হয়ে যাই। বিশেষ করে যারা দ্বীন পালন করতে কিছুটা আগ্রহী হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে বেশী হয়। এটা পুরোপুরী ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার বিপরীত। কাজেই আমাদের উচিৎ হবে আমাদের ব্যবহার সুন্দর করা; চরিত্র, আচার আচরন সুন্দর করা। হাসিমুখে অন্য ভাই এর সাথে কথা বলাও সদকা। ভেবে দেখুন, সামান্য হাসিকেও ইসলাম কত মর্যাদা দিয়েছে! আর ভাল ব্যবহার করতে হবে সবার সাথে। কেউ ভাল ব্যবহার করল বলে আমিও ভাল থাকলাম, বাজে ব্যবহার করল বলে ক্ষেপে গেলাম, তাহলে কিন্তু হলো না। ভাল ব্যবহার করতে হবে সবার সাথে, সর্বাবস্থায়। ঈমানকে পরিপূর্ণ করতে উত্তম চরিত্র অত্যাবশকীয়।    

“তোমাদের মাঝে সেই ব্যক্তিই উত্তম যে সমগ্র মানবজাতির জন্য হিতকর এবং মঙ্গলজনক।” [দারাকুতনী, হাসান]

ইসলাম স্বার্থপরতার ধর্ম নয়। নিজে নিজে এবং নিজস্ব পরিমন্ডলে ইবাদাতে ব্যস্ত থাকা প্রকৃত ইসলাম নয়। বরং, ইসলামের দৃষ্টিতে সেই সব মুমিনগণ উত্তম যারা তাদের জীবদ্দশায় উম্মতের কল্যানের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যায়। মহান আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনই থাকে তাদের আসল উদ্দেশ্য।
প্রত্যেক মানুষেরই কিছু কিছু বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য থাকে। বিশেষ বিষয়ে দক্ষতা গড়ে ওঠে। কাজেই আমাদের প্রত্যেকের উচিত মহান আল্লাহপাক আমাদের যে বিশেষ যোগ্যতা দিয়েছেন, তা মুসলিম উম্মাহ্‌র কল্যানে নিয়োজিত করা। নিজে নিজে উপকৃত হলাম আর হয়ে গেল, ব্যাপারটি এমন নয়। আমাদের প্রত্যেকের মুসলিম উম্মাহ্‌র কল্যান সাধনের কাজটি অপরিহার্য করে নেয়া উচিত। কারণ মুসলিম উম্মাহ্‌র কল্যানে কাজ করার যে নেকি পাওয়া যাবে, তাঁর ওজন মীযানের পাল্লায় অত্যধিক ভারী হবে, জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। আর প্রকৃত মুসলিমের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এটা।

 

“তোমাদের মধ্য হতে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শেখায়।” [দারিমী, সহিহ] 

কোরআন! একজন মুমিনের জীবনে সবথেকে মূল্যবান বস্তু। কোরআনের মাধ্যমেই আমরা ইসলাম জেনেছি। কোরআনই আমাদের দ্বীনের ভিত্তি। হযরত ইক্বরিমাহ বিন আবু জাহল (রাঃ) কোরআন হাতে নিয়ে আবেগ্লাপুত হয়ে বলতেন, “আমার রব্বের কিতাব! আমার রব্বের কিতাব!” এই কোরানের প্রতি আমাদের কঠোর দায়িত্ব রয়েছে। আমাদেরকে এই দায়িত্ব বহন করতেই হবে। 
কাজেই মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হল, কোরআন পড়া, বোঝা, চর্চা করা, চিন্তা ভাবনা করা, এটা অনুযায়ী জীবন যাপন করা এবং এর দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়া। সেই মুসলিমের চেয়ে আর কে উত্তম হতে পারে, যে তাঁর জীবনকে পবিত্র কোরআন শেখা ও শেখানোর কাজে নিয়োজিত করেছে।
বিভিন্নভাবে আমরা কোরআনকে আমাদের জীবনে জরিয়ে নিতে পারি। যেমনঃ তিলাওয়াত করা, তাজবীদ শেখা ও শেখানো, তাফসীর পড়া, কোরানিক আরবী শেখা, মুখস্ত করা ইত্যাদি। এমনকি ইসলাম বিষয়ে পড়াশুনা করার মাধ্যমেও কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। কারণ ইসলাম তো কোরআন ছাড়া আর কিছু নয়। আসুন আমরা উপরের উপায়গুলো থেকে যেকোন একটা উপায়ে কোরআনকে আমাদের জীবনে জড়িয়ে নেই। আমীন।

“তোমাদের মাঝে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তাঁর স্ত্রীর কাছে উত্তম, এবং আমি আমার স্ত্রিদের কাছে সবথেকে উত্তম।” [তিরমীযি, সহীহ] 

আমরা আমাদের স্ত্রী ও পরিবার পরিজনের সাথে জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত সময় কাটিয়ে থাকি। একারণে আমাদের অনেক দোষত্রুটি বাহিরের মানুষের কাছে প্রকাশ না পেলেও পরিবারের সদস্যদের কাছে অবশ্যই প্রকাশ পেয়ে যায়। বাহিরের মানুষের কাছে সেগুলো চেপে রাখা সম্ভব হলেও বাসা বাড়িতে তা চেপে রাখা যায় না। তাই, যে ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী এবং পরিবারের প্রতি সৎ, ভদ্র, বিনয়ী, নম্র স্বভাবের; সে আসলেই সৎ, সে আসলেই উত্তম চরিত্রের অধিকারী।
পরিবারের প্রতি কিভাবে আচরণ করতে হবে তাঁর উত্তম উদাহরণ আমরা রাসুল (সাঃ) এর জীবনী থেকে শিখে নিতে পারি। একজন প্রকৃত মুমিন তাঁর পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন এবং সামাজিক জীবন; এই সবক্ষেত্রেই হবে উত্তম। 

সারমর্মঃ

সামান্য কথায় উপরের আলোচনার সারাংশ করলে আমরা পাইঃ
১।       কোনভাবেই অপরের ক্ষতি করা যাবেনা।
২।       উত্তম চরিত্র এবং ব্যবহারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
৩।      মানব্জাতির কল্যাণে নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হবে।
৪।       কোরআন শিখতে হবে এবং শেখাতে হবে।
৫।       নিজের পরিবারের প্রতি সহানুভুতিশীল হতে হবে।
আসুন, আমরা উপরের পাঁচটি হাদীসের উপর আমল করতে শুরু করি। ইনশা-আল্লাহ, আমরা দুনিয়া এবং আখিরাত এই উভয় স্থানেই সফলতা লাভ করব।

Leave a Reply

SHOPPING CART

close
%d bloggers like this: